বিদেশি আয়কর ফাঁকিবাজ প্রতিরোধে দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও একটি স্থলবন্দরে আয়কর চেকপোস্ট স্থাপন করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

কোনো বিদেশি নাগরিক যাতে আয়কর পরিশোধ না করে দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, এ উদ্দেশ্যে আয়কর বিভাগের আওতায় চেকপোস্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র বিষয়টি রাইজিংবিডিকে নিশ্চিত করেছে।

বন্দরগুলো হলো- রাজধানীর হজরত শাহাজালাল (র.) আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দর।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বন্দরের বহিরগমন চেকপোস্টের দুর্বলতার কারণে আয়কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশিরা দেশ ত্যাগ করছে। এ সব বিষয় বিবেচনা করে এনবিআর অন্যান্য বহিরগমন চেকপোস্টের অনুরূপ আয়কর চেকপোস্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বন্দরগুলোতে আয়কর বিভাগ স্থাপন করার পর প্রত্যেক বিদেশি যাত্রীকে আয়কর বিভাগ থেকে প্রত্যায়নপত্র নিয়ে দেশ ত্যাগ করতে হবে।

এ বিষয়ে এনবিআরে সূত্রে আরো জানা যায়, সম্প্রতি এনবিআরের প্রধান কার্যালয়ে এ বিষয়ে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে চার বন্দরে আয়কর বিভাগ স্থাপনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভিসা প্রক্রিয়ায় আয়করের বিধান বিধিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি করতে হলে বাংলাদেশ ভিসা নীতি, বিদেশি আইন, বিদেশিদের রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, আয়কর অধ্যাদেশ ইত্যাদি বেশ কিছু সংশোধনী আনতে হবে। এজন্য বৈঠক থেকে এ বিষয়ে কার্যকরি উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পুলিশ ইমিগ্রেশন, পুলিশের বিশেষ শাখা, বিনিয়োগ বোর্ড, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো ইত্যাদিতে কোনো আয়কর বিভাগ সংযুক্ত করা হয়নি। এ বিষয়ে এনবিআরের সঙ্গে ওই সংস্থাগুলোর পৃথক পৃথক বৈঠক হয়। ওই সংস্থাগুলো এনবিআরকে আশ্বস্ত করেছে, তারা তাদের কার্য্ক্রমে আয়কর সম্পর্কিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করবে।

এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিনিয়োগ বোর্ড, পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চ, এফবিসিসিআই, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (বেপজা) ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে এনবিআর। এসব প্রতিষ্ঠানে থাকা বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তথ্যও নেওয়া হয়েছে।

সেই সঙ্গে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে কর্মরত নাগরিকের সংখ্যা, দেশ, বেতন, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সময়সহ বিস্তারিত জানতে চেয়ে চিঠি দেয় এনবিআর। এ ছাড়া কর ফাঁকি দেওয়া বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেছেন এনবিআরের কমিশনাররা। এতে বেশ কিছু নতুন বিদেশি নাগরিকের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। এসব তথ্য যাচাই-বাচাই করে বিদেশি নাগরিকদের একটি তালিকা তৈরি করবে স্টিয়ারিং কমিটি। বর্তমানে বৈধ বিদেশি নিবন্ধিত কর্মীর সংখ্যা ১২ থেকে ১৫ হাজার।

কিন্তু এনবিআরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, এ দেশে বিভিন্ন কাজে বা ব্যবসায় প্রায় ৫ লাখ বিদেশি নাগরিক থাকলেও তারা আয়কর বিবরণী দাখিল করেন না। তাদের অনেকেই আয়কর প্রদান না করেই দেশত্যাগ করেন। আবার অনেকের ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর কাজ করছেন। পাশাপাশি নানা খরচ দেখিয়ে অর্থপাচার করছেন তারা। নিজেদের লভ্যাংশও ব্যাংকিং মাধ্যমে না নিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন। এক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে এমন অবৈধ বিদেশি কর্মীর সংখ্যা অনেক বেশি বলেও এনবিআর সূত্রে জানান।

আর এসব ব্যক্তির কাছ থেকে কর আদায়ে এবার আটঘাঁট বেধে নেমেছে এনবিআর। ইতিমধ্যে চলতি অর্থবছরের বাজেট ও অর্থ আইনে বিদেশিদের কাছ থেকে কর আদায়ে ১৮৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ সংশোধনের করা হয়েছে। তাদের খুঁজে বের করতে টাস্কফোর্সের পাশাপাশি স্টিয়ারিং কমিটি কাজ করছে।

আয়কর সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কোনো কর্মী নিয়োগ দিতে চাইলে অবশ্যই তাদের বিনিয়োগ বোর্ডসহ দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে নিবন্ধিত হতে হবে। আয়বর্ষের যে সময়েই কোনো বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করুক না কেন, তাদের কর দিতে হবে। আর কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অবৈধভাবে বিদেশিদের কাজ করার অনৈতিক সুযোগ দেয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিকের তুলনায় ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত কর দিতে হবে। অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এ দুটির মধ্যে যেটির পরিমাণ বেশি হবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেটি আদায় করা হবে।

এদিকে বিদেশি নাগরিকের প্রতি সতর্কতা জারি করে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের বাজেট প্রস্তাবনার পূর্বে এনবিআর বিশেষ আদেশ জারি করে। আদেশে বলা হয়েছে, এনবিআর দেশে ব্যবসাবান্ধব, শিল্পবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ প্রতিষ্ঠার অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশে উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশে বিদেশি নাগরিকদের কাজ করার সুযোগ বিরাজ করছে। পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও বিদেশি নাগরিকের উপার্জিত আয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের বিধানসহ আয়কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে সব কোম্পানি, শিল্প, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, হোটেল ও রেস্টুরেন্টসহ যেসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি নাগরিক নিয়োজিত ও ভবিষ্যতে নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের আয়কর সংক্রান্ত বিধি-বিধান পরিপালন করতে হবে।

আদেশে নিয়োগকারী কোম্পানি, প্রযুক্তি, এনজিও, হোটেলসহ যেসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি নাগরিকরা কর্মরত, তাদেরও আয়করের বিধি-বিধান মেনে চলার অনুরোধ করা হয়েছে। তা ছাড়া কর অঞ্চলগুলো বিদেশি নাগরিকের আয়কর বিবরণী যাচাই ও যেসব নাগরিক আয়কর বিবরণী দাখিল করেন না, তাদের খুঁজে বের করার কাজ শুরু করেছে। এসব ক্ষেত্রে জরিমানা বৃদ্ধিসহ আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এম এ রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম

 

Share Button