আমাদের দেশের মূসক ব্যবস্থায় যে কয়েকটি বিষয় জটিল বলে মনে হয় তন্মধ্যে উৎসে মূসক কর্তন অন্যতম। উৎসে মূসক কর্তনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, পণ্য বা সেবা সরবরাহকারী, অডিটর এবং মূসক কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এ বিষয়টি নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট অস্পষ্টতা এবং জটিলতা, তাই পরিপালনেও রয়েছে শিথীলতা। তবে, উৎসে মূসক কর্তন আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ে আমরা যে পরিমাণ মূসক আদায় করি, তার প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ আদায় হয় উৎসে কর্তনের মাধ্যমে। তাই, উৎসে মূসক কর্তন/আদায় সংক্রান্ত বিধি-বিধান সহজীকরণ অতীব জরুরি। এই লেখায় আমাদের মূসক ব্যবস্থার বর্তমান বিধি-বিধানের আলোকে উৎসে মূসক কর্তন বিষয়টি সহজভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। কতকগুলো টিপ্স এর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে উৎসে মূসক কর্তনের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি আশা করি, এই লেখাটি পাঠ করে উৎসে মূসক কর্তনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, পণ্য বা সেবা সরবরাহকারী, অডিটর এবং মূসক কর্মকর্তা সকলেই উপকৃত হবেন। এই লেখায় উৎসে মূসক কর্তনের বিষয়টি যেভাবে ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হয়েছে, সেই ধারাবাহিকতায় চিন্তা করলে উৎসে মূসক কর্তন সংক্রান্ত যে কোন সমস্যায় সমধানে উপনীত হওয়া সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।

সেবার সরবরাহ গ্রহণের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন

টিপ্স-০১: মনে করুন, আপনি একটি উৎসে মূসক কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানের ফাইনান্স ম্যানেজার। আপনার কাছে একটি বিল পেশ করা হয়েছে। এই বিল পরিশোধ করার জন্য আপনাকে অনুমোদন দিতে হবে। এই বিল থেকে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে কি-না সে বিষয়ে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরূপ কোন বিল আপনার কাছে পেশ করা হলে আপনাকে সর্বপ্রথম চিন্তা করতে হবে যে, এটি সেবা ক্রয়ের বিল নাকি পণ্য ক্রয়ের বিল। বিলটি যদি সেবা ক্রয়ের বিল হয় তাহলে আপনাকে সরাসরি ‘টিপ্স-২’ এ যেতে হবে। আর যদি বিলটি পণ্য ক্রয়ের বিল হয় তাহলে আপনাকে ‘টিপ্স-৬’ এ যেতে হবে। মনে করুন, এটি একটি সেবা ক্রয়ের বিল। তাহলে ‘টিপ্স-২’ দেখুন।

টিপ্স-০২: আমরা জানি যে, উৎসে মূসক কর্তন সংক্রান্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাধারণ আদেশ নং-০৩/মূসক/২০১৪, তারিখ: ০৫ জুন, ২০১৪ এর অনুচ্ছেদ-২ এ ৩৭টি সেবার একটি ছক রয়েছে। ওই ছকের ক্রমিক ৫ হলো বিজ্ঞাপনী সংস্থা সেবা এবং ক্রমিক ১৮ হলো যোগানদার (চৎড়পঁৎবসবহঃ চৎড়ারফবৎ) সেবা। ওই দু’টি সেবা বাদ দিলে অবশিষ্ট থাকে ৩৫টি সেবা। ওই দু’টি সেবার বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে। ওই দু’টি সেবা বাদ দিলে যে ৩৫টি সেবা অবশিষ্ট থাকে সেসব ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন করা বাধ্যতামূলক। সকল পরিস্থিতিতে ওই ৩৫টি সেবার ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে। মূসক চালান (মূসক-১১) থাকলেও কর্তন করতে হবে, না থাকলেও কর্তন করতে হবে, মূসক পরিশোধিত থাকলেও কর্তন করতে হবে, পরিশোধিত না থাকলেও কর্তন করতে হবে, চুক্তিতে মূসক উল্লেখ থাকলেও কর্তন করতে হবে, উল্লেখ না থাকলেও কর্তন করতে হবে, মূসক অন্তর্ভুক্ত মূল্য হলেও কর্তন করতে হবে, মূসক বহির্ভুত মূল্য হলেও কর্তন করতে হবে। মোট কথা, সব পরিস্থিতিতে ওই ৩৫টি সেবার ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে। এমন কোন পরিস্থিতি নেই যেখানে ওই ৩৫টি সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে না।

টিপ্স-০৩: উপরের টিপ্স-এ আলোচনা করা হয়েছে যে, ৩৫টি সেবার ক্ষেত্রে সব পরিস্থিতিতে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে। এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। তা হলো, যদি সেবা সরবরাহকারী প্রযোজ্য মূসক পরিশোধ করে সেবা প্রদান করেন এবং যদি উপরের নিয়মানুসারে উৎসে মূসক কর্তন করা হয়, তাহলে একই সেবার ওপর দু’বার মূসক পরিশোধিত হয়ে যায়। উৎসে মূসক কর্তন সংক্রান্ত সাধারণ আদেশে এ প্রশ্নের সমাধান দেয়া হয়েছে। ওই আদেশের অনুচ্ছেদ ৫(ক)-তে উল্লেখ আছে যে, এরূপ পরিস্থিতিতে উৎসে মূসক কর্তনকারী কর্তৃক ইস্যুকৃত উৎসে মূসক কর্তনের প্রত্যয়নপত্র (মূসক-১২খ) অনুসারে চলতি হিসাব ও দাখিলপত্রে একবার পজিটিভ সমন্বয় করে নিতে হবে।

টিপ্স-০৪: ‘বিজ্ঞাপনী সংস্থা’ সেবার ক্ষেত্রে নিয়ম একটু আলাদা। তা হলো, সেবা প্রদানকারী বিলের সাথে মূসক চালান দাখিল করবেন। মূসক চালান সেবা প্রদানকারীর সংশ্লিষ্ট মূসক সার্কেল অফিসের রাজস্ব কর্মকর্তা বা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে। এভাবে মূসক চালান সত্যায়িত থাকলে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে না। সত্যায়িত না থাকলে ১৫ শতাংশ হারে মূসক উৎসে কর্তন করতে হবে ।

টিপ্স-০৫: এ পর্যন্ত ৩৬টি সেবা আলোচনা করা হয়েছে। যোগানদার সেবা পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে। যোগানদারসহ হলো ৩৭টি সেবা। আপনার কাছে যে বিলটি পেশ করা হয়েছে সে বিল যদি ওই ৩৭টি সেবার বাইরের কোন সেবা ক্রয় সংক্রান্ত হয়, তাহলে প্রথমত আপনার উৎসে মূসক কর্তন করার দায়িত্ব নেই। তবে, সেবা প্রদানকারী প্রযোজ্য মূসক পরিশোধ করেছেন কিনা তা দেখার দায়িত্ব আপনার রয়েছে। আপনি মূসক চালান এবং ট্রেজারী চালান অথবা চলতি হিসাব রেজিস্টারের ফটোকপি দেখে নিশ্চিত হবেন যে, সেবা প্রদানকারী প্রযোজ্য মূসক পরিশোধ করেছেন কিনা। সকল ক্ষেত্রেই মূসক চালান থাকতে হবে। এমন একটি মূসক চালান থাকাই যথেষ্ট যা আপতঃদৃষ্টিতে সঠিক বলে মনে হয়। তাহলে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে না। মূসক চালান থাকার পরও আপনি মূসক জমাপ্রদান অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্যে ট্রেজারী চালান চাইতে পারেন। সেবা প্রদানকারী যদি ট্রেজারী চালানের কপি সরবরাহ করেন তাহলে আপনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, ওই সেবার ওপর প্রযোজ্য মূসক পরিশোধ করা হয়েছে। তাই, আপনার আর উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে না। সেবা প্রদানকারী যদি তার চলতি হিসাব রেজিস্টারে (মূসক-১৮) মূসক বিয়োগ করে থাকেন তাহলে চলতি হিসাব রেজিস্টারের সংশ্লিষ্ট অংশের ফটোকপি নেয়া যায়। সেখানে দেখতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট মূসক চালানটি সেখানে এন্ট্রি দিয়ে মূসক বিয়োগ করা আছে কিনা। উক্ত ৩৭টি সেবার বাইরের কোন সেবার ক্ষেত্রে এভাবে আপনি যখন নিশ্চিত হবেন যে, সেবা প্রদানকারী প্রযোজ্য মূসক পরিশোধ করেছেন, তাহলে আপনাকে আর উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে না। কিন্তু আপনি যদি নিশ্চিত হন যে, সেবা প্রদানকারী প্রযোজ্য মূসক পরিশোধ করেননি তাহলে আপনাকে মূসক (প্রযোজ্য হারে) উৎসে কর্তন করতে হবে। আমরা যোগানদার ছাড়া সব সেবা আলোচনা করে ফেলেছি। পরবর্তী টিপ্স এ পণ্যের ওপর উৎসে মূসক কর্তন আলোচনা করার সময় যোগানদার সেবা আলোচিত হবে। কারণ, যোগানদার সেবা হলো পণ্য সরবরাহ সংক্রান্ত সেবা।

পণ্যের সরবরাহ গ্রহণের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন

টিপ্স-০৬: মনে করুন, আপনি একটি উৎসে মূসক কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানের ফাইনান্স ম্যানেজার। আপনার কাছে একটি বিল পেশ করা হয়েছে। এই বিল পরিশোধ করার জন্য আপনাকে অনুমোদন দিতে হবে। এই বিল থেকে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে কিনা সে বিষয়ে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরূপ কোন বিল আপনার কাছে পেশ করা হলে আপনাকে সর্বপ্রথম চিন্তা করতে হবে যে, এটি সেবা ক্রয়ের বিল, নাকি পণ্য ক্রয়ের বিল। ধরুন বিলটি পণ্য ক্রয়ের বিল।

টিপ্স-০৭: এখন আপনাকে বুঝতে হবে যে পণ্য সরবরাহকারীর স্ট্যাটাস কি? অর্থাৎ সরবরাহকারী কি একজন উৎপাদক, নাকি তিনি একজন ব্যবসায়ী নাকি তিনি একজন যোগানদার। “মূসক-৬” ফরম, ভ্যাট রেজিস্টেশন সার্টিফিকেট, টিআইএন, ট্রেড লাইসেন্স, টেন্ডার, চুক্তিনামা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দলিলাদি দেখে নিশ্চিত হতে হবে যে সরবরাহকারী উৎপাদক, নাকি ব্যবসায়ী, নাকি যোগানদার। প্রয়োজনে সরবরাহকারীর অঙ্গন পরিদর্শন করতে হবে।

টিপ্স-০৮: সরবরাহকারী উৎপাদক হলে এবং মূসক চালানসহ সরবরাহ দিলে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে না। উৎপাদক মূসক চালান ছাড়া সরবরাহ দিলে ১৫ শতাংশ মূসক উৎসে কর্তন করতে হবে। সরবরাহকারী ব্যবসায়ী হলে এবং মূসক চালানসহ সরবরাহ দিলে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে না। ব্যবসায়ী মূসক চালান ছাড়া সরবরাহ দিলে ৪ শতাংশ মূসক উৎসে কর্তন করতে হবে। সরবরাহকারী যোগানদার হলে ৪ শতাংশ মূসক অবশ্যই উৎসে কর্তন করতে হবে। কারণ, যোগানদার উপরে বর্ণিত বাধ্যতামূলকভাবে উৎসে মূসক কর্তনের ৩৬টি সেবার তালিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

টিপ্স-০৯: কে যোগানদার: যোগানদার উৎপাদক নয়, যোগানদার ব্যাবসায়ী নয়। যোগানদার উৎপাদকের নিকট থেকে ক্রয় করে সরবরাহ করেন। যোগানদার ব্যবসায়ীর নিকট থেকে ক্রয় করে সরবরাহ করেন; এবং যোগানদার টেন্ডার বা কার্যাদেশের বিপরীতে আমদানি করে সরবরাহ করেন। প্যাকেজ ভ্যাটের (ছোট দোকান) আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রয় করলে যোগানদার হিসেবে ৪ শতাংশ মূসক উৎসে কর্তন করতে হবে। ব্যবসায়ী এবং যোগানদারের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, ব্যবসায়ী ক্রয় করে নির্দিষ্ট স্থান হতে সরবরাহ করেন। আর যোগানদার ক্রয় বা আমদানি করে সরাসরি সরবরাহ করেন।

টিপ্স-১০: কে যোগানদার নয়:
(ক) আইনের প্রথম তফসিল দ্বারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(খ) উৎপাদক বা ব্যবসায়ী (প্যাকেজ ভ্যাট ব্যতীত) কর্তৃক মূসক চালানসহ পণ্যের সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(গ) টার্নওভার কর বা কুটির শিল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তালিকাভুক্তি নম্বরসম্বলিত ক্যাশমেমোসহ পণ্যের সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(ঘ) সেবাসমূহের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে বিধায় কোন সেবার সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না। তবে, সেবা কিনে সরবরাহ দিলে যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে। যেমন: ফার্ণিচার।
(ঙ) স্কুলের টিফিন সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(চ) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত কার্যাদেশ এর বিপরীতে মুদ্রিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর এবং সমমান পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(ছ) তুলা সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(জ) ওয়েস্ট এন্ড স্ক্র্যাপ পেপার সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(ঝ) ভাঙ্গা কাঁচের টুকরা (পঁষষবঃ) সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(ঞ) প্লাস্টিক বর্জ্য সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
(ট) জিলেটিন ক্যাপসুলের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত গরু ও মহিষের হাড় সরবরাহ যোগানদার হিসেবে বিবেচিত হবে না।

উৎসে মূসক কর্তন সংক্রান্ত কোন বিষয়ে অনুগ্রহ করে উপরে বর্ণিত ধারাবাহিকতায় চিন্তা করুন।
—————————————————————————————————————–

ড. মোঃ আব্দুর রউফ

লেখক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের পরিচালক এবং ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক।

Share Button