Call Now
+8801746440021
Send e-mail
ceo.bdvat@gmail.com
Menu

ভ্যাট

১। মূল্য সংযোজন কর (মূসক) কি?

মূল্য সংযোজন কর বা মূসক একটি পরোক্ষ কর, যা ভোক্তার নিকট হতে আদায়যোগ্য। বাংলাদেশে ভোগকৃত পণ্য বা সেবা মূল্যের উপর ১৫% হারে এই কর আরোপিত। অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য/সেবা ব্যতীত বাংলাদেশে উৎপাদিত, সরবরাহকৃত বা আমদানীকৃত সকল পণ্য ও সেবার উপর মূসক প্রযোজ্য। বাংলাদেশের ভিতর সম্পাদিত লেনদেনের জন্য যিনি পণ্য বা সেবা সরবরাহ করেছেন তার কাছ থেকে মূসক আদায় করা হয়ে থাকে। তাদেরকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন বিভাগীয় মূসক অফিসে নিবন্ধিত হতে হয় এবং কর মেয়াদের (সাধারণত: প্রতিটি ইংরেজি মাস) শেষে কর পরিশোধ ও দাখিলপত্র পেশ করতে হয়। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মূসক আদায় করে থাকেন। শুল্ক স্টেশনে শুল্ক-করাদি আদায়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আমদানি পণ্য খালাসের আগেই আমদানিকারকের নিকট থেকে এই মূসক আদায় করা হয়। যথাযথ মূসক পরিশোধের দায়িত্ব আমদানীকারক বা পণ্য বা সেবা সরবরাহকারী নিবন্ধিত ব্যক্তির। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সরবরাহকারী ক্রেতার কাছ থেকে যে মূল্য গ্রহণ করেন তাতে মূসক অন্তর্ভুক্ত থাকে; তাই, ক্রেতাই সরবরাহকারীকে কর প্রদান করেন, আর সরবরাহকারী আদায়কৃত কর (প্রয়োজনীয় উপকরণ কর রেয়াত সমন্বয়ের পর) সরকারী কোষাগারে জমা প্রদান করেন। গ্রাহক বা ক্রেতার নিকট থেকে মূল্য না পেলেও অর্থাৎ কোন পণ্য/সেবা বিক্রি না হলেও সরবরাহকারীকে তার শূন্য করদায়িতা বিষয়ে নির্দিষ্ট কর মেয়াদ শেষে হিসাব (দাখিলপত্র) পেশ করতে হবে।

মূসক বা ভ্যাট একটি স্ব-নির্ধারণী কর ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় নিবন্ধিত করদাতাগণ নিজেরাই তাদের প্রদেয় করের পরিমাণ নির্ধারণ করে, তা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তাদের দাখিলপত্রে উল্লেখ করেন এবং ট্রেজারি চালানের কপিসহ দাখিলপত্র স্থানীয় মূসক কার্যালয়ে দাখিল করেন। করদায়িতার (দাখিলপত্র ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দলিলাদি) অডিটকরণ বা সঠিকতা যাচাই পরবর্র্র্তী সময় সম্পাদিত হয়ে থাকে।

২। চূড়ান্ত ভোক্তাই মূসক পরিশোধ করেন বা মূসক এর ভার বহন করেন:

নিবন্ধিত করদাতা যে মূল্যে তার পণ্য বা সেবা সরবরাহ করেন সেই মূল্যের উপর নির্দিষ্ট হারে মূসক পরিশোধ করেন। পণ্যের উৎপাদন থেকে বিতরণ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে যখনই পণ্যের হাত বদল হয়, তার প্রতিটি ক্ষেত্রে মূসক পরিশোধিত হয়ে থাকে। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও তাই। যদিও বিক্রয় মূল্যের সাথে ক্রয়মূল্যের পার্থক্যই মূল্য সংযোজন, তথাপি বিক্রয় মূল্যের উপর নির্ধারিত হারে মূসকের পরিমাণ হিসেব করতে হয়। তবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই (যে ক্ষেত্রে কর রেয়াত গ্রহণ করা যায়) করদাতা প্রদেয় মূসক থেকে তার সরবরাহকৃত পণ্য বা সেবায় ব্যবহৃত উপকরণ ক্রয় বা আমদানীর ক্ষেত্রে যে মূসক পরিশোধ করেছেন তা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মূসক সরকারের ট্রেজারীতে জমা করেন। একজন ব্যবসায়ী তার পণ্য/সেবা বিক্রয়ের উপর যে মূসক প্রদান করেন তাকে বলা হয় উৎপাদ কর। আর তিনি তার পণ্য/সেবা তৈরীতে ব্যবহৃত উপকরণ ক্রয়ের জন্য যে মূসক দিয়ে এসেছেন তাকে বলা হয় উপকরণ কর। এ দুটির পার্থক্যের পরিমাণ মূসক করদাতা কর্তৃক পরিশোধিত হয়। প্রতিটি স্তরে, এই পরিমাণ মূসকই সরকারের কোষাগারে জমা দেয়া হয়। চূড়ান্ত ভোক্তার উপরই করের আপতন বর্তায়।

একটি উদাহরণের সাহায্যে এই ধারণাটি বোঝানো যেতে পারেঃ

একজন সিমেন্ট প্রস্তুতকারক ক্লিংকার আমদানি পূর্বক সিমেন্ট তৈরি করে তা ডিলারের কাছে বিক্রয় করলেন ১৫,৭৫০ টাকা + মূসক দিয়ে।
ওই ডিলার ১৪% মূল্য সংযোজন করে উক্ত সিমেন্ট একজন মিডিয়াম হোলসেলারের কাছে বিক্রি করলেন ১৭,৯৫৫ + মূসকসহ মূল্যে।
অত:পর মিডিয়াম হোলসেলার ঐ সিমেন্ট পুনরায় ১৪% মূল্য সংযোজন করে খুচরা বিক্রেতার নিকট বিক্রয় করলেন ২০৪৬৮.৭০ + ১৫% মূসকসহ মূল্যে। খুচরা বিক্রেতা পুনরায় ক্রয়মূল্যের সাথে ১৪% মূল্য সংযোজন করে চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট বিক্রয় করবেন ২৩,৩৩৪.৩২ + ১৫% মূসকসহ মূল্যে। এই ক্ষেত্রে ভ্যাট পরিশোধিত হবে নিম্নোক্তভাবেঃ

১ আমদানি মূল্য ১০,০০০/- টাকার সাথে ৭.৫% কাস্টমস ডিউটি যোগ করে
২ মূল্য সংযোজন = ট্রান্সপোর্ট, শ্রমিক, মেশিনারী অবচয়, ওভারহেড ইত্যাদি খরচসহ অন্যান্য সকল খরচ ও মুনাফা
৩ উপকরণ মূল্যের সাথে ১৪% মূল্য সংযোজন ধরে

এক্ষেত্রে ক্লিংকার আমদানিপূর্বক সিমেন্ট উৎপাদককে তার বিক্রয়ের উপর ১৫% হারে ২৩৬২.৫০ টাকা মূসক আদায় করে উপকরণ কর ৬১২.৫০ টাকা রেয়াত গ্রহণের পর সরকারকে নীট মূসক ৭৫০ টাকা জমা দিতে হবে। ডিলারকে তার বিক্রয়ের উপর ২৬৯৩.২৫ টাকা মূসক আদায় করে উপকরণ কর ২৩৬২.৫০ টাকা রেয়াত গ্রহণের পর সরকারকে নীট ৩৩০.৭৫ টাকা মূসক প্রদান করতে হবে। হোলসেলারকে তার বিক্রয়ের মূল্যের উপর ১৫% হারে ৩০৭০.৩১ টাকা মূসক আদায় করে উপকরণ কর ২৬৯৩.২৫ টাকা রেয়াত গ্রহণের পর অবশিষ্ট ৩৭৭.০৬ টাকা মূসক সরকারকে জমা দিতে হবে। তেমনি খুচরা বিক্রেতাকে তার বিক্রয় মূল্যের উপর ১৫% হারে ৩৫০০.১৫ টাকা মূসক আদায় পূর্বক উপকরণ কর ৩০৭০.৩১ টাকা রেয়াত গ্রহণ করে সরকারকে ৪২৯.৮৪ টাকা মূসক জমা দিতে হবে। এখানে সরকারী কোষাগারে মোট মূসক জমা হচ্ছে আমদানি পর্যায়ে পরিশোধিত মূসক ১৬১২.৫০ টাকা এবং বিক্রয় পর্যায়ে পরিশোধিত মূসক ১৮৮৭.৬৫ টাকা মোট ৩৫০০.১৫ টাকা। খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে যিনি ক্রয় করেছেন সে ক্রেতার উপর এই মোট মূসক ৩৫০০.১৫ টাকার ভার পড়ছে, কারণ ঐ ক্রেতা এখানে চূড়ান্ত ভোক্তা। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায়, ব্যবসার প্রতিটি স্তরে সংযোজিত মূল্যের উপর প্রদেয় মূসকের পুরো ভার পড়ে চূড়ান্ত ভোক্তার উপর।

৩। মূসকের হার, পরিধি, মূসক ব্যবস্থায় ব্যক্তি ও নিবন্ধন :

৩.১। হার ও পরিধি

বাংলাদেশে মূসকের হার হচ্ছে ১৫%। কোনো পণ্য বা সেবা সুনির্দিষ্টভাবে মূসক থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত না হয়ে থাকলে, কোনো নিবন্ধিত ব্যক্তি কর্তৃক বিক্রিত সকল পণ্য ও সেবার
ক্ষেত্রে এই হারে মূসক প্রযোজ্য। যে সব পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে ১৫% হারে মূসক প্রযোজ্য নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে হয় শূন্য হার প্রযোজ্য, নয় তো সেগুলো অব্যাহতিপ্রাপ্ত। অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য/ সেবা মূসক পরিধির বাইরে রয়েছে।

৩.২। সম্পূরক শুল্ক

মূল্য সংযোজন কর আইনের আওতায় “সম্পূরক শুল্ক” নামে এক ধরণের কর আদায় করা হয়। কতিপয় পণ্য ও সেবার উপর বিভিন্ন হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা আছে। সাধারণত: অভিজাত পণ্য ও সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত পণ্যের উপর সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়। মূসক নিবন্ধিত ব্যক্তি মূসক আদায়ের সাথে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এই সম্পূরক শুল্কও আদায় করে থাকেন এবং মূসক জমা দেয়ার সময় ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে সম্পূরক শুল্কও সরকারী কোষাগারে জমা দিয়ে থাকেন। চলতি হিসাবে ও মূসক রিটার্ণে সম্পূরক শুল্কের হিসাব রাখা হয়। কোনো নিবন্ধিত ব্যক্তি কর্তৃক পরিশোধিত সম্পূরক শুল্ক উপকরণ কর হিসেবে বিবেচিত না হওয়ায় তিনি এই শুল্কের রেয়াত গ্রহণ করতে পারেন না। তবে, পণ্য বা সেবা রপ্তানি করলে উক্ত রপ্তানিকৃত পণ্যের উপকরণের ওপর প্রদত্ত উপকরণ কর সম্পূরক শুল্কসহ (প্রজ্ঞাপনে অনুমোদিত নয় এমন সম্পূরক শুল্ক ব্যতীত) রেয়াত নেয়া যায়।

৩.৩। টার্নওভার কর

‘টার্নওভার’ বলতে কোনো ব্যক্তির কোনো নির্দিষ্ট সময়ে করযোগ্য পণ্য বা সেবা সরবরাহের বিপরীতে প্রাপ্ত বা প্রাপ্য মোট অর্থকে বোঝানো হয়।
যে সকল করযোগ্য পণ্য প্রস্তুতকারী বা করযোগ্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মূসক নিবন্ধন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা নেই, সে সকল প্রতিষ্ঠান তাদের বার্ষিক টার্ণওভারের উপর ৪% হারে টার্ণওভার কর প্রদান করবে। তবে, কতিপয় পণ্য ও সেবার ওপর টার্ণওভার কর প্রযোজ্য নয় – মূসক প্রদান বাধ্যতামূলক।

৩.৪। মূসক ব্যবস্থায় ব্যক্তি

মূসক ব্যবস্থায় ‘ব্যক্তি’ বলতে স্বাভাবিক ও আইনী উভয় ব্যক্তিকে বাঝানো হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে, ব্যক্তি বলতে বোঝায় একক মালিকানা,পার্টনারশিপ, লিমিটেড কোম্পানী, ক্লাব, অন্যান্য আন-ইনকর্পোরেটেড সংস্থা বা ব্যবসায় পরিচালনার জন্য কান ব্যক্তিবর্গের গ্রুপ।

৩.৫। নিবন্ধন

ব্যবসায় নিয়োজিত যে কোন ব্যক্তির নিজেকেই মূল্যায়ন করতে হবে যে তার মূসক নিবন্ধন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আছে কী-না। একজন বসায়ীকে সবার আগে জানতে হবে তিনি যে পণ্য বা সেবার ব্যবসায় করেন তা করযোগ্য কী-না। মূল্য সংযোজন কর, আইন, ১৯৯১ এর প্রথম তফসিলে করযোগ্য নয় এমন পণ্যের এবং দ্বিতীয় তফসিলে করযোগ্য নয় এমন সবার তালিকা রয়েছে। সাধারণভাবে বলা যায় যে, সকল প্রকার প্রাথমিক, কৃষিজ, প্রাণীজ পণ্য (মোড়ক বা টিনজাত ব্যতীত) মূল্য সংযোজন কর থেকে অব্যহাতি প্রাপ্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে পণ্য যেমন- মদ, স্পিরিট, এ্যালকোহল ইত্যাদি উৎপাদনও মূল্য সংযোজন কর এর আওতা বহির্ভূত। সবার ক্ষেত্রে জীবন ধারনের জন্য মৌলিক সেবা, (যেমন- কৃষি জমি প্রস্তুতকারী, সেচ প্রদানকারী, পোকামাকড় ও বালাইনাশকারী, শাক-সবজি, মোড়কাবদ্ধকরণ কৃষি বীজ বিতরণকারী, মৎস্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) সমাজ কল্যাণমূলক সেবা, সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যক্তিগত সেবা (যেমন- সাংবাদিক, অভিনেতা, গায়ক, ক্রীড়াবিদ, নিকাহ রজিস্ট্রার, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ইত্যাদি), সকল প্রকার ধর্মীয় আচার

অনুষ্ঠান, ধর্মীয় স্থান ও স্থাপনার সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মূল্য সংযোজন কর থেকে অব্যাহতি প্রাপ্ত।এছাড়া, সরকার অথবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে আমদানি বা উৎপাদন পর্যায়ে অথবা আমদানি ও উৎপাদন উভয় পর্যায়ে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এমন পণ্য/সেবাও মূল্য জন কর এর আওতা বহির্ভূত। অব্যাহতি প্রাপ্ত সকল পণ্য/সেবা সম্পর্কে জানার লক্ষ্যে নিকটস্থ মূল্য সংযোজন কর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে। পণ্য/সেবা করযোগ্য না হলে তার নিবন্ধন গ্রহণের প্রয়োজন নেই। তবে, তিনি চাইলে,যেমনটি পরে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বেচ্ছা বন্ধন গ্রহণ করতে পারেন। আবার তিনি যদি করযোগ্য পণ্য বা সেবা সরবরাহ করেন তাহলে নিশ্চিত হতে হবে তার বছরে টার্নওভার বা মোট বিক্রয়ের রিমাণ ৬০ লক্ষ টাকা বা এর বেশী কী-না যদি তা না হয়, সে ক্ষেত্রেও তার নিবন্ধন নেয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে, তাকে টার্নওভার কর এ লিকাভুক্ত হতে হবে অথবা এ ক্ষেত্রেও তিনি ইচ্ছা করলে স্বেচ্ছা নিবন্ধন গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়া,কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানের মূলধনী যন্ত্রপাতির মূল্য ২৫ লক্ষ টাকার কম ও টার্ণওভার ৪০ লক্ষ টাকার কম হলে এবং প্রতিষ্ঠানটি লি: কোম্পানী না হলে সে প্রতিষ্ঠানকে মূসকের আওতায় নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে না। এমন প্রতিষ্ঠানকে কুটির শিল্পের আওতায় তালিকাভুক্ত হতে হবে। উল্লেখ্য, কুটির শিল্পের উপর বর্তমানে কোন কর প্রযোজ্য নেই। তবে, প্রজ্ঞাপনে বর্ণীত কতিপয় প্রতিষ্ঠান কুটির শিল্পের বা টার্নওভার করের সুবিধা পাবে না। নিবন্ধিত হওয়ার পর, নিবন্ধিত ব্যক্তিকে তার সকল বিক্রয়ের জন্য মূসক প্রদান করতে হবে, মাসিক দাখিলপত্র/রির্টাণ পেশ করতে হবে এবং আইন ও বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা তিপালন করতে হবে। আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী তিনি উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ করতে পারবেন।

নির্ধারিত ফরম মূসক-৬ (পরিশিষ্ট-১) প্রয়োজনীয় দলিলপত্রাদিসহ আবেদনের দুই কার্যদিবসের মধ্যে বিভাগীয় কর্মকর্তা মূসক/ভ্যাট নিবন্ধন নম্বরসহ একটি নিবন্ধনপত্র ইস্যু করে থাকেন। এই নিবন্ধনপত্র বা সার্টিফিকেটটি দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে ব্যবসা অঙ্গনে প্রদর্শন করতে হয়।সরকার অথবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোনো বিশেষ ধরনের ব্যবসাকে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি প্রদান করতে পারে।

যেসব ব্যবসায়ী কোন করযোগ্য পণ্য বা সেবা সরবরাহ করেন না বা করযোগ্য ব্যবসা করলেও মনে করেন যে তার বার্ষিক টার্ণওভার ৬০ লক্ষ টাকা বা এর বেশী না তারা স্বেচ্ছা নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারেন। স্বেচ্ছা নিবন্ধন গ্রহণ করলে তাদেরকে মূসক পরিশোধ করতে হবে এবং তাদের উপর আর সব নিবন্ধিত ব্যক্তির মতো দায় দায়িত্ব ও অধিকার বর্তাবে।
ব্যবসায়ীসহ কতিপয় পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্ণওভার যাই হোক না কেন, মূসক নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এ ধরণের প্রতিষ্ঠানের তালিকা (পরিশিষ্ট ২) এ দেয়া হয়েছে।
যে কোনো ব্যক্তিকে তার প্রতিটি স্বতন্ত্র ব্যবসা অঙ্গনের জন্য পৃথক মূসক রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তির যদি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে দুইটি ফ্যাক্টরী ও একটি হোটেল থাকে, তবে তাকে তিনটি মূসক নিবন্ধন নিতে হবে। কিন্তু কোনো ট্রেডিং ব্যবসা (উৎপাদন বা প্রস্তুতকরণ ব্যতীত) বা সেবা প্রদান যদি বিভিন্ন স্থানে পরিচালনা করা হয় এবং সকল বিক্রয় কেন্দ্রের যাবতীয় হিসাব কেন্দ্রীয়ভাবে এক জায়গায় সংরক্ষণ করা হয়, সে ক্ষেত্রে ওই ব্যবসায়ী/ সেবা প্রদানকারী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আবেদন করে একটি মাত্র কেন্দ্রীয় নিবন্ধনের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পেতে পারেন।

৪। সরবরাহ :

পণ্য বা সেবা সরবরাহের উপর মূসক পরিশোধ করতে হয়। মূসক আইনে ‘সরবরাহ’ শব্দটিকে সুবিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই সংজ্ঞায় বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত বা উৎপাদিত পণ্য, প্রদত্ত সেবা বা কোন ব্যবসায়ী কর্তৃক আমদানীকৃত, ক্রয়কৃত, অর্জিত বা অন্য কোনভাবে সংগৃহীত পণ্যের ক্ষেত্রে পণের বিনিময়ে বিক্রয়, হস্তান্তর ইজারা বা পণের বিনিময়ে বা অন্যকোন উপায়ে উক্তরূপ পণ্যের বা সেবার নিষ্পত্তিকরণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া, এই সংজ্ঞায় আরো অন্তর্ভুক্ত আছেঃ -ব্যবসায় কার্য পরিচালনাকালে অর্জিত, প্রস্তুতকৃত বা উৎপাদিত পণ্যের বা সেবার ব্যক্তিগত, ব্যবসায় সংক্রান্ত বা ব্যবসায় বহির্ভূত কাজে ব্যবহার; -পণ্যের প্রস্তুত বা উৎপাদন বা ব্যবসায় স্থল হতে পণ্য খালাস বা অপসারণ;কোন ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের নিমিত্তে কোন পণ্যের বা সেবার নিলাম বা বিলিবন্দেজ ইত্যাদি;

৫। অব্যাহতি ও শূন্যহার:

মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১এর প্রথম তফসিলে উল্লিখিত পণ্যসমূহ এবং দ্বিতীয় তফসিলে উল্লিখিত সেবাসমূহ মূসক থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। তাছাড়া, কিছু কিছু পণ্য ও সেবাকে সময় সময় সরকার বা বোর্ড প্রজ্ঞাপন বা আদেশ দ্বারা মূসক হতে অব্যাহতি দিতে পারেন। মূল্য সংযোজন কর আইনের ধারা ৩ এর উপধারা (২) এ কোন্্ কোন্্ সরবরাহের (মূলত: রপ্তনির সময়) ক্ষেত্রে শূন্য হার প্রযোজ্য তা বর্ণনা করা হয়েছে।
‘‘শূন্য হার’’ বলতে বোঝানো হয় যে- এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পণ্য বা সেবা করযোগ্য কিন্তু করের হার শূন্য।
‘শূন্য’ হার প্রযোজ্য হয় বিধায় এ ধরনের পণ্য ও সেবা প্রকৃতপক্ষে করযোগ্য পণ্য ও সেবা। তাই এমন সব পণ্য ও সেবার ব্যবসায়ীকে মূসক নিবন্ধন গ্রহণসহ মূসক সংক্রান্ত অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা প্রতিপালন করতে হয়। শূন্য হারের ক্ষেত্রে কোন কর প্রদান করতে হয় না, তবে, একজন ব্যবসায়ী শূন্য হারে সরররাহকৃত পণ্য বা সেবায় যে উপকরণ ব্যবহার করেন তার উপর পরিশোধিত মূসক এই কর ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রেয়াত হিসাবে ফেরত নিতে পারেন। অন্যদিকে, অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য বা সেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে এই উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণের সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে, অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য ও সেবা মূসক নেটওয়ার্কের বাইরে। অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য ও সেবার ব্যবসা করেন এমন ব্যক্তিকে মূসক নিবন্ধন গ্রহণ করতে হয় না। তিনি তার পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোন মূসক আরোপ করতে পারেন না। তাই, তার সরবরাহকৃত পণ্য বা সেবার জন্য কোনো উপকরণ কর পরিশোধ করে থাকলেও তিনি তা ফেরৎ পান না। ফলে, অব্যাহতি প্রাপ্ত পণ্য বা সেবা কখনো পুরোপুরি মূসকের ভার থেকে মুক্ত হতে পারে না; কেননা, ব্যবসায়িক লেনদেনের প্রতিটি পর্যায়েই কিছু না কিছু কর-উপাদান থাকে যা সংশ্লিষ্ট পণ্য বা সেবার বিক্রয় মূল্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তবে, অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য উৎপাদনকারী বা সেবাপ্রদানকারী স্বেচ্ছায় নিবন্ধন গ্রহণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে তাকে মূসক পরিশোধ করতে হবে। আরো উল্লেখ্য যে, একই অঙ্গনে করযোগ্য পণ্য/সেবা ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য/সেবা অথবা স্থানীয় ভোগের জন্য করযোগ্য পণ্য/সেবা ও রপ্তানিযোগ্য পণ্য/সেবা উৎপাদন বা সরবরাহ প্রদান করা হলে সেক্ষেত্রে করযোগ্য ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত সকল পণ্য/সেবার হিসাব সংরক্ষণ, চালানপত্র প্রদান ইত্যাদি সম্পাদন করতে হয়। তবে,কান অঙ্গনে শুধুমাত্র অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বা শুধুমাত্র অব্যাহতিপ্রাপ্ত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোন মূসক হিসাবপত্র সংরক্ষণ করতে হবে না বা মূসক চালানপত্র ইস্যু করতে হবে না।

৬। কর পরিশোধের সময়

যে সময়ে পণ্য বা সেবা সরবরাহের উপর মূসক পরিশোধ করা আবশ্যক হয়, তাকে বলা হয় কর পরিশোধের সময়। এই কর পরিশোধের সময় যে হারে কর ধার্য থাকে সেই হারেই কর পরিশোধ করতে হয়।
মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থায় নিম্নবর্ণিত কার্যাবলীর মধ্যে যা সবার আগে ঘটে সেটিই কর
পরিশোধের সময়:
-যখন পণ্য/সেবা অর্পণ প্রদান করা হয়;
-যখন পণ্য/সেবা সরবরাহ সংক্রান্ত চালানপত্র প্রদান করা হয়;
-যখন কোন পণ্য/সেবা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হয় বা অন্যের ব্যবহারের জন্য
প্রদান করা হয়;
-যখন আংশিক বা পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায়। আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে, পণ্যের খালাস নেয়ার আগে, শুল্ক করাদি পরিশোধের সময়, মূসক পরিশোধ করতে হয়।

৭। সরবরাহের ক্ষেত্রে মূসক আরোপযোগ্য মূল্য :

৭.১। আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্য ঃ

ঞযব ঈঁংঃড়সং অপঃ, ১৯৬৯ এর ঝবপঃরড়হ-২৫ এবং ২৫অ অনুযায়ী কোনো পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের সাথে শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, রেগুলেটরী ডিউটি ইত্যাদি যোগ করে উক্ত মূল্যের উপর মূসক হিসাব করা হয়।

৭.২। বাংলাদেশে উৎপাদিত বা সরবরাহকৃত পণ্য/সেবার ক্ষেত্রে মূল্য:

বাংলাদেশে উৎপাদিত বা সরবরাহকৃত পণ্য/সেবার ক্ষেত্রে যে মূল্যের উপর মূসক প্রযোজ্য হবে তা হচ্ছে প্রাপ্ত মূল্য বা পণ। এই মূল্যের মধ্যে বিক্রেতার মুনাফা, কাঁচামালসহ সকল উপকরণের মূল্য, উৎপাদন সংশ্লিষ্ট সকল খরচ, সকল কমিশন, চার্জ বা ফি এবং কাঁচামালসহ সকল উপকরণের উপর প্রদত্ত শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

৮। আমদানীকৃত ও উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ঘোষণা:

আমদানীকৃত বা উৎপাদিত বা অন্য কোনভাবে সংগৃহীত পণ্য সরবরাহের পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তার নিকট একটি মূল্য ঘোষণা প্রদান করতে হয়। এই ঘোষণায় কিভাবে পণ্যের বিক্রয় মূল্য ধার্য্য করা হয়েছে তা মূল্যভিত্তিতে দেখানো হয়। মূল্যভিত্তি পরিবর্তিত হলে পুনরায় নূতন মূল্য ঘোষণা প্রদান করতে হয়।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে ফরম “মূসক-১” এ মূল্য ঘোষণা প্রদান করতে হয়। ট্যারিফ মূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে ফরম “মূসক-১ক” তে উপকরণ-উৎপাদ সম্পর্ক বা সহগ ঘােষণা প্রদান করতে হয়। বাণিজ্যিক আমদানিকারক বা ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে ফরম “মূসক-১খ” তে মূল্য ঘোষণা প্রদান করতে হয়। অব্যাহতিপ্রাপ্ত এবং রপ্তানিকৃত বা রপ্তানিকৃত হিসেবে বিবেচিত পণ্যের ক্ষেত্রে ফরম “মূসক-১গ” তে উপকরণ-উৎপাদ সম্পর্ক বা সহগ ঘাষণা প্রদান করতে হয়। পণ্যের গায়ে/ ধারকে/পাত্রে/মোড়কে মুদ্রিত খুচরা মূল্যের দুই-তৃতীয়াংশ ভিত্তিতে ঘোষণা প্রদানের ক্ষেত্রে ফরম “মূসক-১ঘ” ব্যবহার করতে হয়। ঘােষিত মূল্য অনুমোদন সাপেক্ষে অনুমোদিত মূল্যের ওপর মূসক প্রদান করতে হয়। আমদানি পর্যায়ে শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের সাথে কাস্টমস ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক এবং অন্যান্য শুল্ক ও কর (অগ্রীম আয়কর ব্যতীত) যোগ করে মূসকযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য “মূল্য ঘোষণা” বিষয় পুস্তিকা-৪ দেখা যেতে পারে।

৯। উপকরণ কর :

৯.১। উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ:

মূসক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একজন নিবন্ধিত করদাতা তার সরবরাহকৃত পণ্য বা সেবার উপর প্রদেয় মূসক(উৎপাদ কর) এর বিপরীতে উক্ত পণ্য বা সেবায় ব্যবহৃত উপকরণের উপর পরিশোধিত মূসক (উপকরণ কর) ফেরত নিতে পারেন। এই ফেরত নেয়াই কর রেয়াত গ্রহণ।
করযোগ্য পণ্য বা সেবা সরবরাহের সাথে সংশ্লিষ্ট পণ্য/সেবাই উপকরণ। উপকরণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে-

-পণ্য প্রস্তুতকরণের জন্য আমদানীকৃত বা বাংলাদেশের ভেতর থেকে সংগৃহীত সকল কাঁচামাল
-পুনঃ বিক্রয়ের জন্য আমদানীকৃত বা ক্রয়কৃত যে কোনো পণ্য
-ল্যাবরেটরী রিএজেন্ট, ল্যাবরেটরী ইকুইপমেন্ট এবং ল্যাবরেটরী এ্যাকসেসরীজ; -যে কোন গ্যাস, জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত যে কোন পদার্থ -মোড়ক সামগ্রী -সেবা (টেলিফোন, বিদ্যুৎ ইত্যাদি)
-যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ
একজন নিবন্ধিত ব্যক্তি উপকরণের উপর যে মূসক প্রদান করেন তা-ই উপকরণ কর । উল্লেখ্য, উপকরণের উপর পরিশোধিত সম্পূরক শুল্ক ও টার্নওভার কর রেয়াত গ্রহণ করা যায় না।
কবল মূসক নিবন্ধিত করদাতা করযোগ্য পণ্য বা সেবা সরবরাহের বিপরীতে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ করতে পারেন। অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য বা সেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে উক্ত পণ্য বা সবায় ব্যবহৃত উপকরণের উপর কোনো কর রেয়াত পাওয়া যায় না।

উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণের পূর্বে যে উপকরণের উপর কর রেয়াত গ্রহণ করা হবে তা নিবন্ধিত করদাতার ব্যবসা অঙ্গনে থাকতে হবে এবং এ উপকরণ ক্রয় সংক্রান্ত চালানপত্র বা বিল অব এন্ট্রি তার নিজ নামে এবং তার দখলে থাকতে হবে।
ব্যবসায় অঙ্গনে উপকরণ প্রবেশের পর, ক্রয় হিসাব রেজিস্টারে এন্ট্রি দেয়ার পরবর্তী ২ (দুই) করমেয়াদের মধ্যে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ করতে হবে।
মাসিক দাখিলপত্রে মোট প্রদেয় উৎপাদ কর হিসাব করে তা থেকে মোট উপকরণ কর বাদ
দেয়া হয়; উৎপাদ করের পরিমাণ উপকরণ করের চেয়ে বেশী হলে অতিরিক্ত কর নীট কর হিসাবে সরকারী কোষাগারে জমা প্রদান করতে হয়; অন্যদিকে, উৎপাদ করের পরিমাণ উপকরণ করের কম হলে পরবর্তী করমেয়াদে তা জের হিসাবে প্রদর্শন করা হয়।

৯.২। যে সব ক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ করা যায় না:

একান্তভাবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হলেও বা শুধুমাত্র করযোগ্য পণ্য বা সেবা সরবরাহের সাথে সম্পৃক্ত হলেও কতিপয় ক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ করা যায় না।
যেমন-
(১) অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের উপর পরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর;
(২) টার্ণওভার করের আওতাভুক্ত করদাতার নিকট হতে সংগৃহীত উপকরণের উপর পরিশোধিত টার্ণওভার কর;
(৩) পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদানে ব্যবহৃত উপকরণের উপর পরিশোধিত সম্পূরক শুল্ক ;
(৪) প্রথমবার ব্যতীত অন্য কোন দফায় পুনঃ ব্যবহারযোগ্য মোড়কের উপর পরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর;
(৫) করযোগ্য পণ্য উৎপাদন বা করযোগ্য সেবা প্রদানের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হলেও
কান দালান-কোঠা বা অবকাঠামো বা স্থাপনা নির্মাণ, সুষমীকরণ, আধুনিকীকরণ, প্রতিস্থাপন, সম্প্রসারণ, পুনঃসংষ্কারকরণ ও মেরামতকরণ, সকল প্রকার আসবাবপত্র, ষ্টেশনারী দ্রব্যাদি, এয়ারকন্ডিশনার, ফ্যান, আলোক সরঞ্জাম, জনারেটর ইত্যাদি ক্রয় বা মেরামতকরণ, স্থাপত্য পরিকল্পনা ও নক্শা ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্ট পণ্য এবং সেবার উপর পরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর;
(৬) করযোগ্য পণ্য উৎপাদন বা সরবরাহ বা করযোগ্য সেবা প্রদানের সাথে সম্পৃক্ত, বিধি দ্বারা নির্ধারিত, বিভিন্ন পণ্য ও সেবা এবং তার উপর পরিশোধিত মূল্য সংযোজন করের হারের অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন কর;
(৭) ভ্রমণ, আপ্যায়ন, কর্মচারীর কল্যাণ ও উন্নয়নমূলক কাজের ব্যয়ের বিপরীতে পরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর;
(৮) পণ্যের করযোগ্য মূল্য ভিত্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয় এমন উপকরণের বিপরীতে পরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর; এবং নির্ধারিত পরিমাণ মূল্য সংযোজনের ভিত্তিতে মূসক প্রদানকারী ব্যবসায়ী কর্তৃক ক্রয়কৃত উপকরণের উপর পরিশোধিত উপকরণ কর;
(৯) সংকুচিত মূল্যভিত্তির সেবা প্রদানকারী কর্তৃক ক্রীত উপকরণের উপর পরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর;
(১০) ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে পণ্য সরবরাহকারী কর্তৃক ক্রীত উপকরণের উপর পরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর;
(১১) পণ্যের সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী বা সেবা প্রদানকারীর নিবন্ধন সংখ্যা ব্যতীত অন্য
কোন নিবন্ধন সংখ্যা সম্বলিত বিল অব এন্ট্রি বা চালানপত্রে উল্লিখিত উপকরণ কর;
(১২) অন্যের অধিকারে, দখলে, তত্ত্বাবধানে রক্ষিত পণ্যের উপর পরিশোধিত মূল্য সংযোজন কর ;
(১৩) ক্রয় হিসাব পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত নয় এমন উপকরণের ওপর পরিশোধিত মূসক;
(১৪) ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে খালাসকৃত উপকরণ এর ওপর পরিশোধিত মূসক ব্যাংক গ্যারান্টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রেয়াত নেয়া যাবে না;
(১৫) এক লক্ষ টাকা বা তদূর্ধ্ব মূল্যের উপকরণ ব্যাংকিং বা ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম ব্যতীত নগদে ক্রয় করলে এরূপ উপকরণের ওপর পরিশোধিত মূসক।

৯.৩। আংশিকভাবে রেয়াতযোগ্য উপকরণ কর :
উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত কিছু সেবার বিপরীতে পরিশোধিত কর ১০০% উপকরণ কর হিসাবে রেয়াত গ্রহণ করা যায় না। এসব সেবার ক্ষেত্রে কি পরিমাণ উপকরণ কর রেয়াত পাওয়া যাবে তা নিম্নে দেখানো হলো : বীমা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিতরণের উপর পরিশোধিত মূসকের ৮০% রেয়াতযোগ্য। নিম্নোক্তক্ষেত্রে পরিশোধিত মূসকের ৬০% রেয়াতযোগ্য : -টেলিফোন, টেলিপ্রিন্টার, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট -ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স -ক্লিয়ারিং ও ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট -ওয়াসা -অডিট, একাউন্টিং ফার্ম -যোগানদার -আইন পরামর্শক -সিকিউরিটি সার্ভিস -পরিবহন ঠিকাদার -ঋণপত্র

৯.৪। করযোগ্য ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য/ সেবা একই সাথে উৎপাদন বা সরবরাহের ক্ষেত্রে
রেয়াতের বিধান:
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণের সুযোগ নেই। কোনো করদাতা যদি একই সাথে করযোগ্য ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য বা
সেবা সরবরাহ করেন তবে তিনি করযোগ্য পণ্য বা সেবায় যে উপকরণ ব্যবহার করেছেন শুধু তার উপরই রেয়াত পাবেন। প্রতি করমেয়াদের মূসক দাখিলপত্রে অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য বা সেবায় ব্যবহৃত উপকরণের হিসাব দিতে হবে এবং চলতি হিসাবে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে।
৯.৫। ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত উপকরণের ক্ষেত্রে কর রেয়াত:
ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত বা অন্যকোনোভাবে সরবরাহের অনুপযোগী পণ্যের নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় মূল্য সংযোজন কর কার্যালয়ে আবেদন করতে হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষান্তে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তা এরূপ পণ্যের নিষ্পত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন এবং তদানুযায়ী ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের ক্ষেত্রে উক্ত পণ্য প্রস্তুত করণে ব্যবহৃত উপকরণ বাবদ গৃহীত উপকরণ কর রেয়াত বাতিল হবে। এ মর্মে করদাতা চলতি হিসাব ও দাখিলপত্রে সমন্বয় করবেন।

৯.৬। অতিরিক্ত উপকরণ কর:

উপকরণ কর যদি উৎপাদ করের চেয়ে বেশী হয় তবে, যে পরিমাণে বেশী হবে তা করদাতার চলতি হিসাবে জের হিসাবে থেকে যাবে এবং তিনি পরবর্তী কর মেয়াদের প্রদেয় করের সাথে তা সমন্বয় করতে পারবেন।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো মাসে যদি একজন করদাতার পরিশোধিত উপকরণ করের পরিমাণ ৭৫,০০০ টাকা এবং ঐ একই মাসে তার সরবরাহকৃত পণ্য/সেবার বিপরীতে প্রদেয় মূসকের (উৎপাদ করের) পরিমাণ ৬০,০০০ টাকা হয়, তবে সেই মাসে উক্ত করদাতার দাখিলপত্রে নীট প্রদেয় হিসাবে কোনো অংক প্রদর্শিত হবে না; বরং জের কলামে ১৫,০০০ টাকা থাকবে। এটা ধারাবাহিকভাবে অগ্রায়িত হবে এবং পরবর্তী মাসের দাখিলপত্রে তিনি তা থেকে প্রদেয় মূসক সমন্বয় করতে পারবেন। যে সব করদাতাদের উপকরণ কর
রেয়াতের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে বিশেষ করে যারা একই সাথে স্থানীয়ভাবে বিক্রি এবং রপ্তানি করেন তাদের ক্ষেত্রে, তাদের জন্য কর প্রত্যর্পণ পাওয়ার বিশেষ সুযোগ আছে।

৯.৭। কর প্রত্যর্পণ পদ্ধতি

নিবন্ধিত রপ্তানিকারকরগণ তাদের পণ্যের রপ্তানি সম্পন্ন হওয়ার পর দাখিলপত্রের ভিত্তিতে মূসক ও অন্যান্য শুল্ক করাদি প্রত্যর্পণ গ্রহণ করতে পারেন। প্রত্যর্পণ কম সময়ে পাওয়ার জন্য সরাসরি শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরে (উঁঃু ঊীবসঢ়ঃরড়হ ্ উৎধনিধপশ ঙভভরপব-উঊউঙ) আবেদন করার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে “মূসক ব্যবস্থায় প্রত্যর্পণ কার্যক্রম” পুস্তিকা-১৫ দেখা যেতে পারে।

১০। বিশেষ ব্যবস্থাসমূহ:

১০.১। সংকুচিত ভিত্তিমূল্য (প্রকৃত মূল্য সংযোজনের বা নির্ধারিত মূল্য সংযোজনের হার) :

পণ্য বা সেবা সরবরাহের বিনিময়ে প্রাপ্ত পূর্ণ মূল্যের উপর মূসক আরোপ করা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ করা বিশ্বব্যাপী মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এমন অনেক ব্যবসায়ী আছেন যাদের পক্ষে উপকরণ কর রেয়াত নেয়ার জন্য যে পদ্ধতিতে হিসাব সংরক্ষণ করতে হয় বা যে সব দলিলাদি রাখতে হয়, তা তাদের পক্ষে রাখা সম্ভব হয় না। এই ধরণের সমস্যা নিরসনের জন্য বিশ্বের অনেক দেশে বিশেষ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

সংকুচিত ভিত্তিমূল্যের উপর মূসক প্রদান এ ধরনের একটি সহজীকৃত বিশেষ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে পণ্যের মোট মূল্যের (উপকরণ মূল্য + মূল্য সংযোজন) পরিবর্তে মূল্য সংযোজনের পরিমাণকে বিবেচনায় রাখা হয়। সহজ ভাষায় বলতে গেলে সংকুচিত ভিত্তিমূল্য পদ্ধতি হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যে পদ্ধতিতে কোন পণ্য/সেবার মোট মূল্যের একটি অংশকে করযোগ্য মূল্য হিসেবে ধার্য করা হয় এবং ঐ আংশিক মূল্যের উপর ১৫% হারে মূসক পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশের মূসক ব্যবস্থায় কতিপয় সেবার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিতে মূসক পরিশোধের বিধান রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোন নির্মাণ সংস্থার নির্মাণ কাজের করযোগ্য মূল্য ১,০০,০০০/-টাকা হলে, এক্ষেত্রে এই মূল্যের উপর ১৫% হারে ১৫,০০০/- টাকা মূসক পরিশোধযোগ্য। কিন্তু এই সেবার ক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণের অসুবিধা বিবেচনা করে সরকার নির্মাণ সংস্থার ক্ষেত্রে করযোগ্য মূল্য ১,০০,০০০/- টাকার পরিবর্তে ৩৬,৬৭০/- টাকা ধার্য করায় অর্থাৎ নির্মাণ কাজের করযোগ্য মূল্যের ৩৬.৬৭% এর উপর মূসক পরিশোধের সুবিধা প্রদান করল। এই সুবিধা পাওয়ার প্রেক্ষিতে নির্মাণ সংস্থাকে ১,০০,০০০/- টাকার ৩৬.৬৭% অর্থাৎ ৩৬,৬৭০/- টাকার উপর ১৫% হারে ৫,৫০০/- টাকা মূসক পরিশোধ করতে হবে। অন্য কথায় বলা যায়, ১,০০,০০০/- টাকার উপর ৫.৫% হারে মূসক পরিশোধ করতে হবে অর্থাৎ নীট মূল্য সংযোজন করের হার ৫.৫%।

সংকুচিত ভিত্তিমূল্যে কর প্রদানকারী বিক্রেতা কর্তৃক উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণের কোন সুযোগ নেই। কারণ, এই সংকুচিত ভিত্তিমূল্যের ক্ষেত্রে হিসাব এমনভাবে করা হয়েছে যে, একজন ব্যবসায়ী উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ করে যে পরিমাণ নীট মূসক সরকারী কোষাগারে জমা দিতেন, সংকুচিত মূল্যভিত্তিতে প্রদেয় মূসকের পরিমাণও তাই। তবে, সংকুচিত ভিত্তিমূল্যের কোন সেবাপ্রদানকারী যদি নিজের জন্য সুবিধাজনক মনে করেন তবে তিনি সংকুচিত মূল্যভিত্তির পরিবর্তে মোট করযোগ্য মূল্যের উপর ১৫% মূসক প্রদান করতে পারবেন এবং রেয়াত নিতে পারবেন। এটি একটি স্বেচ্ছাধীন ব্যবস্থা। অর্থাৎ, যেসব সেবারক্ষেত্রে এই সংকুচিত মূল্যভিত্তি নির্ধারিত আছে, সেসব ব্যবসায় নিয়োজিত করদাতারা ইচ্ছা করলে মূসকের স্বাভাবিক পদ্ধতিতে মূসক পরিশোধের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

১০.২। আমদানীর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী মূসক উৎসে কর্তন/ অগ্রিম আদায়:

বাণিজ্যিক আমদানীকারক কর্তৃক আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী মূসক আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর্তনের বিধান আছে। এই ব্যবস্থায় আমদানীকৃত পণ্য পাইকারী/খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে যে মূসক প্রদেয় হয় তা আমদানী পর্যায়ে অগ্রিম/ উৎসে আদায় করা হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আমদানীকৃত পণ্যের মূসক আরোপযোগ্য মূল্যের সাথে আরো ২০% মূল্য সংযোজন করে অগ্রিম মূসক আদায় করা হয়ে থাকে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমদানি পর্যায়ে কোন পণ্যের মূসক আরোপযোগ্য মূল্য ১০০/- টাকা হলে ১০০/- টাকার সাথে ২০% অর্থাৎ ২০/- টাকা যোগ করে ২০/- টাকার উপর ১৫% হারে অথবা ১২০ টাকার উপর ৩% হারে ব্যবসায়ী মূসক অগ্রিম/ উৎসে আদায় করতে হবে। নি¤œবর্ণিত আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী মূসক অগ্রিম/ উৎসে কর্তনযোগ্য বা আদায়যোগ্য নয়- সরকারী, আধা-সরকারী প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্ত্বশাসিত সংস্থা, জাতিসংঘভুক্ত সংস্থা, দূতাবাস, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিজেদের ব্যবহারের জন্য আমদানিকৃত পণ্য, ১০০% রপ্তানিযোগ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যার হাউস কর্তৃক আমদানিকৃত পণ্য, সরকারী, আধা-সরকারী ও স্বায়ত্ত্বশাসিত সংস্থা, ব্যাংক-বীমা ও এনজিও-তে দরপত্রের বা কার্যাদেশের ভিত্তিতে যোগানদার হিসাবে সরবরাহের উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত পণ্য, মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আমদানিকৃত পণ্য, সরকারী প্রজ্ঞাপনের আওতায় ত্রান হিসাবে আমদানিকৃত পণ্য, অন্ধ ও বধিরদের জন্য আমদানিকৃত পণ্য, সাময়িকভাবে আমদানিকৃত পণ্য ও মাননীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক অব্যাহতি সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত গাড়ি অথবা জীপের ক্ষেত্রে।

কোনো প্রস্তুতকারক বাণিজ্যিক আমদানিকারকের নিকট থেকে কোনো উপকরণ ক্রয় করলে তিনি উক্ত উপকরণের উপর পরিশোধিত মূসক, তার কাছে প্রয়োজনীয় দলিলাদি থাকা সাপেক্ষে, রেয়াত হিসাব গ্রহণ করতে পারেন।

১০.৩। অভিন্ন মূল্যে পণ্য বিক্রয় :

কোন উৎপাদানকারী কর্তৃক উৎপাদন পর্যায়ে বা আমদানিকারক কর্তৃক সরবরাহ পর্যায়ে পণ্যের গায়ে বা ধারকে বা প্যাকেটে দৃশ্যমান স্থানে অনপনীয় কালিতে মূল্য মুদ্রিত থাকলে উক্ত মূল্যের উপর প্রথম সরবরাহকালে মূল্য সংযোজন কর পরিশোধ করা হলে, সরবরাহের অন্য কোনো পর্যায়ে নতুন করে আর মূসক প্রদান করতে হবে না। এজন্য যে ব্যবসায়ী এই প্রক্রিয়ায় মূসক প্রদান করতে চাইবেন তাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আবেদন করে অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে অনুমতি প্রাপ্তির পর স্থানীয় বিভাগীয় কর্মকর্তা উক্ত প্রতিষ্ঠানের পণ্যসমূহের মূল্য (খুচরা মূল্যসহ) অনুমোদন করবেন।

১০.৪। উৎসে মূসক কর্তন :

নিম্নলিখিত প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে কোন পণ্য/ সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে মূসক উৎসে কর্তন করে তা সরকারী কোষাগারে জমা প্রদান করতে হবে ঃ -সরকারী ও আধা-সরকারী প্রতিষ্ঠান -স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান -এনজিও -ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান -লিমিটেড কোম্পানী -শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উক্ত উৎসে কর্তনকারী দপ্তর/প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক সকল ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন করতে হবে। এক্ষেত্রে : ক্স যে সকল ক্ষেত্রে সংকুচিত মূল্যভিত্তি নির্ধারিত আছে, সে সকল ক্ষেত্রে সংকুচিত মূল্যভিত্তিতে উৎসে কর্তন করতে হবে।যে সকল পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ১৫% মূসক প্রযোজ্য, সে সকল ক্ষেত্রে যদি সরবরাহকারী পণ্য/ সেবা সরবরাহের সময় প্রকৃত মূসক-১১ চালানপত্র ইস্যু না করে, তাহলে উৎসে কর্তনকারী ১৫% হারেই উৎসে কর্তন করবে।

১৫% মূসক প্রদানপূর্বক ‘মূসক-১১’ চালানপত্র ইস্যু করে কোন পণ্য বা সেবা সরবরাহ প্রদান করা হলে সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩% হারে উৎসে কর্তন করতে হবে।
সেবা আমদানির ক্ষেত্রে, যে ব্যাংকের মাধ্যমে সেবা মূল্য পরিশোধ করা হবে, উক্ত ব্যাংক কর্তৃক সেবা মূল্য পরিশোধকালে সেবা মূল্যের উপর ১৫% হারে মূসক কর্তন/ আদায় করা হবে।
সকল ক্ষেত্রেই উৎসে কর্তনকারী ‘মূসক-১২খ’ ফরমে প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করবেন। অতিরিক্ত ৩% কর্তনের ক্ষেত্রে পণ্য বা সেবা সরবরাহকারী পরবর্তীতে তার দাখিলপত্র বা চলতি হিসাবে সমন্বয় করে নিতে পারবেন।

১১। চালানপত্র :

১১.১। কর চালানপত্র :

কর চালানপত্র হচ্ছে মূসক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দলিল। মূসক নিবন্ধিত যে কোন ব্যক্তিকে তার করযোগ্য পণ্য বা সেবার সকল সরবরাহের ক্ষেত্রে মূ
সক চালানপত্র ইস্যু করার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। করযোগ্য পণ্য বা সেবা সরবরাহ এবং মূসক প্রদানের প্রমাণপত্র হচ্ছে এই চালানপত্র। প্রতিটি সরবরাহের জন্য আলাদা মূসক চালানপত্র ইস্যু করতে হয়। মূসক বিধিমালায় নির্ধারিত ফরম মূসক-১১ বা মূসক-১১ক এ চালানপত্র ইস্যু করতে হয়। নিবন্ধিত ব্যক্তির নিকট সরবরাহ/বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ফরম মূসক-১১ এবং অনিবন্ধিত ব্যক্তির নিকট সরবরাহ/ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ফরম মূসক-১১ক এ কর চালানপত্র প্রদান করতে হয়। ফরম মূসক-১১ ও মূসক-১১ক যথাক্রমে পরিশিষ্ট-৩ ও পরিশিষ্ট-৪ এ দেয়া হয়েছে। চালানপত্র ইস্যুকারী ফরমে বর্ণিত তথ্যাদি ছাড়াও তার প্রয়োজনে অন্য কোন তথ্য এই চালানপত্রে লিখতে পারেন।
দ্বিমুখী কার্বন ব্যবহার করে মূসক চালানপত্র তিন কপিতে প্রস্তুত করতে হয় এবং তা বিতরণ করা হয় নিম্নোক্তভাবে ঃ
-মূল কপি দেয়া হয় পণ্য বা সেবার ক্রেতাকে এবং তা পণ্য/সেবার গন্তব্য পর্যন্ত সাথে থাকতে হবে। -দ্বিতীয় কপি পণ্য সরবরাহের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মূল্য সংযোজন কর কার্যালয়ে প্রেরণ করতে হবে। -তৃতীয় কপি সরবরাহকারী নিজের কাছে সংরক্ষণ করবেন।

করদাতা প্রতিষ্ঠান নিজেরা কোন পণ্য বা সেবা ভোগ/ব্যবহার করলেও দিনের শেষে স্বনামে একটি সম্মিলিত চালানপত্র ইস্যু করবেন এবং এই চালানপত্রের মূল ও তৃতীয় অনুলিপি পণ্য প্রস্তুতকরণ বা উৎপাদনস্থলে বা ব্যবসায়স্থলে রাখতে হবে এবং দ্বিতীয় অনুলিপি বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট মূল্য সংযোজন কর কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।
করদাতা সংশ্লিষ্ট মূসক কমিশনারের অনুমোদানক্রমে কম্পিউটারের মাধ্যমে কর চালানপত্র ইস্যু ও সংরক্ষণ করতে পারেন।
কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে (হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টান্ন ভান্ডার, আসবাবপত্রের বিপণন কেন্দ্র, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, মেট্রোপলিটন এলাকার অভিজাত শপিং সেন্টারের অন্তর্ভুক্ত সকল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, জেনারেল স্টোর, অন্যান্য বড় ও মাঝারী পাইকারী ও খুচরা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, স্বর্ণকার ও রৌপ্যকার, স্বর্ণের ও রৌপ্যের দোকানদার এবং স্বর্ণ পাকাকারী) ব্যবহার এর মাধ্যমে মূসক চালানপত্র ইস্যু করা বাধ্যতামূলক। তাদেরকে ব্যবহারের মাধ্যমে মূসক চালানপত্র ইস্যু করতে হবে।

১১.২। মূসকসহ কর চালানপত্র:

কিছু সেবার ক্ষেত্রে সেবাপ্রদানকারীরা মূসকসহ কর চালানপত্র প্রদান করতে পারেন; এক্ষেত্রে কর চালানপত্রে তাদেরকে মূসকের পরিমাণ আলাদাভাবে দেখাতে হয় না। মূসকসহ মূল্যকে ভ্যাট ফ্যাক্টর (১৫% হারে মূসক প্রদানের সময় ৩/২৩) দিয়ে গুণ করে মূসকের পরিমাণ পাওয়া যায়।
১১.৩। ডেবিট ও ক্রেডিট নোট:

পণ্য সরবরাহ বা সেবা প্রদানের পর কোন কারণে তা আংশিক বা সম্পূর্ণ ফেরত আসলে অথবা যেক্ষেত্রে চালানপত্রে প্রকৃত করের তুলনায় অধিক কর উল্লিখিত হয় সেক্ষেত্রে চালানপত্রটি বাতিল করে ’মূসক-১২’ ফরমে একটি ক্রেডিট নোট ইস্যু করা যাবে। তবে, পণ্য সরবরাহের ৯০ দিন পর অথবা পণ্যের গুণগত মান খারাপ হওয়ার কারণে পণ্য ফেরৎ আনা হলে ক্রেডিট নোট ইস্যু করা যাবে না। অন্যদিকে চালানপত্রে প্রকৃত করের তুলনায় কম পরিমাণ কর উল্লিখিত হলে চালানপত্রটি বাতিল করে ’মূসক-১২ক’ ফরমে একটি ডেবিট নোট ইস্যু করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে। ডেবিট নোট বা ক্রেডিট নোট এর একটি অনুলিপি পরবর্তী কার্যদিবসের মধ্যে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কর কার্যালয়ে প্রেরণ করতে হবে।

১২। হিসাব পুস্তক ও দলিলাদি:

মূসক নিবন্ধিত ব্যক্তিকে তার নিজস্ব বাণিজ্যিক দলিলের পাশাপাশি মূসক বিধিমালার কিছু নির্ধারিত দলিলাদি নির্ধারিত ফরমে সংরক্ষণ করতে হয়। যেমন- ক্রয় হিসাব পুস্তক (ফরম মূসক-১৬), বিক্রয় হিসাব পুস্তক (ফরম মূসক-১৭)। ক্রয় ও বিক্রয় হিসাব পুস্তকের পাশাপাশি একজন নিবন্ধিত প্রস্তুতকারককে নির্ধারিত ফরমে চলতি হিসাব পুস্তক (ফরম মূসক-১৮) সংরক্ষণ করতে হয়। এই চলতি হিসাব পুস্তকে তার যাবতীয় ক্রয়-বিক্রয়, উপকরণ কর রেয়াত ও ট্রেজারীতে জমার পরিমাণ লিপিবদ্ধ থাকে। মূসক দাখিলপত্র/রিটার্ন জমা দেয়ার সময় চলতি হিসাবের একটি অনুলিপি জমা দিতে হয়। তবে,সেবা প্রদানকারী (সিনেমা হল ব্যতীত) করদাতাদের জন্য চলতি হিসাব সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়।
একজন করদাতাকে ব্যবসা সংক্রান্ত যাবতীয় দলিলাদি ছয় বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হয়। তবে, কোন আইনী কার্যক্রম চলতে থাকলে সংশ্লিষ্ট দলিলাদি উক্ত কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। নিবন্ধিত ব্যক্তি কর্তৃক সংরক্ষণযোগ্য দলিলাদি বিষয়ে আরো জানার জন্য “হিসাব পুস্তক ও দলিলাদি সংরক্ষণ” পুস্তিকা নং-৫ দেখা যেতে পারে।

১৩। মূসক দাখিলপত্র :

নিবন্ধিত করদাতাদেরকে প্রতিমাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পূর্ববর্তী মাসের দাখিলপত্র (ফরম মূসক-১৯) (পরিশিষ্ট-৫) প্রয়োজনীয় প্রামাণিক দলিলপত্রাদিসহ স্থানীয় মূল্য সংযোজন কর অফিসে জমা দিতে হয়। ১৫ তারিখ ছুটির দিন হলে তার পূর্ববর্তী কার্যদিবসে জমা প্রদান করতে হবে। শুধুমাত্র বীমা কোম্পানীর ক্ষেত্রে ২০ তারিখের মধ্যে দাখিলপত্র জমা দেয়ার বিধান আছে। সাধারণভাবে, একটি দাখিলপত্র একটি ইংরেজি ক্যালেন্ডার মাসের জন্য প্রযোজ্য।

মূসক দাখিলপত্র বা রিটার্ন হচ্ছে এমন একটা দলিল যেখানে একজন করদাতা একটি নির্দিষ্ট করমেয়াদে তার যাবতীয় করদায়িতার হিসাব প্রদর্শন করেন। প্রদেয় করের পাশাপাশি, এই রিটার্নে যাবতীয় ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে দেখানো হয়। এই তথ্যসমূহ কর প্রশাসন করদাতার করদায়িতার যথার্থতা নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করেন। সরকারের পরিসংখ্যানগত কারণেও এ তথ্য ব্যবহার করা হয়। একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে করদাতার কার্যক্রম ও করদায়িতা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় মূসক দাখিলপত্র
থেকে। তাই, কর ব্যবস্থাপনার জন্য দাখিলপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

১৪। কর পরিশোধ

বাংলাদেশ ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখাসমূহে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে প্রদেয় কর পরিশোধ করতে হয়। ট্রেজারী চালান তৈরী হয় তিন কপি। ট্রেজারি চালানে সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটের হিসাব কোডসহ অন্যান্য হিসাব কোড সঠিকভাবে লিখতে হবে। করদাতা কর্তৃক সংরক্ষিত চলতি হিসাব নামক রেজিস্টারের জমার ঘরে ট্রেজারীতে জমাকৃত টাকার হিসাব রাখা হয়। সরকারী কোষাগারে প্রদেয় কর জমা দেয়ার প্রমাণ হিসাবে দাখিলপত্রের সাথে ট্রেজারী চালানের কপিও সংযুক্ত করতে হয়। মূল্য সংযোজন কর বিভিন্ন কমিশনারেটের হিসাব কোডসহ অন্যান্য হিসাব কোড পরিশিষ্ট-৬ এ দেখানো হয়েছে।

১৫ আপীল পদ্ধতি

মূল্য সংযোজন কর আইনের অধীন মূল্য সংযোজন কর কর্মকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত সিদ্ধান্তে সংক্ষুদ্ধ হলে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীল করার বিধান রয়েছে। কোন ব্যক্তি কোন মূল্য সংযোজন কর কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে সংক্ষুদ্ধ হলে নিম্নোক্তভাবে আপীল করতে পারেন ঃ

Share Button